০১ অক্টোবর ২০২৬
নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে অনলাইনে সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত ও কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করতে সহজলভ্য ও ভুক্তভোগীবান্ধব অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থা, দ্রুত তদন্ত ও প্রতিকার প্রক্রিয়া এবং প্রয়োজনীয় আইনি ও সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছে CSWC প্ল্যাটফর্ম। অক্টোবর মাসকে বিশ্বব্যাপী ‘সাইবার সচেতনতা মাস ২০২৬’ হিসেবে পালনের প্রেক্ষাপটে ডিজিটাল পরিসরে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেবল সচেতনতা বৃদ্ধিই নয়; বরং সেইসাথে কার্যকর প্রতিরোধ, জবাবদিহি এবং ভুক্তভোগীদের জন্য সহজলভ্য প্রতিকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার উপরে বিশেষ গুরুত্বারোপ করছে এই প্ল্যাটফর্ম।
প্ল্যাটফর্মের বিগত জানুয়ারী ২০২৫ – সেপ্টেম্বর ২০২৬ এক বছরেরও বেশী সময়ে ফেসবুক পেজে প্রাপ্ত অভিযোগের বিশ্লেষণে দেশে প্রযুক্তিনির্ভর সাইবার সহিংসতা, ব্যক্তিগত তথ্য, পরিচয় ও গোপনীয়তার অপব্যবহারের একটি উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-নির্ভর বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ব্যক্তির মর্যাদা, গোপনীয়তা ও ডিজিটাল নিরাপত্তার জন্য ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।
CSWC প্ল্যাটফর্মের জানুয়ারী ২০২৫ – সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত প্রাপ্ত অভিযোগের বিশ্লেষণে দেশে সাইবার সহিংসতার এক উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে:
● মোট অভিযোগ: গত ১ বছর ৯ মাসে প্ল্যাটফর্মে মোট ৮০টি অভিযোগ জমা পড়েছে, যার মধ্যে ৫৫ জন ভুক্তভোগীই নারী এবং ১২ জন পুরুষ (বাকি ১৩ জনের লিঙ্গ শনাক্ত করা যায়নি)।
● পারিবারিক প্রভাব: পুরুষ আবেদনকারীদের মধ্যে ৫ জন তাদের স্ত্রী, নাবালক কন্যা সন্তান, ভাগ্নি বা নারী স্বজনদের পক্ষে সহায়তা চেয়েছেন, যা প্রমাণ করে সাইবার সহিংসতার প্রভাব পুরো পরিবারের ওপর পড়ে এবং নারীরা অনেকেই এখনো এ বিষয়ে সরাসরি অভিযোগ করতে আসেন না।
● অভিযোগের ধরন: অন্তরঙ্গ ছবি/ভিডিও ফাঁসের হুমকি, ক্ষতিসাধন করার উদ্দেশ্যে অন্তরঙ্গ ছবি/ভিডিও আপত্তিকর মন্তব্যসহ প্রকাশ ও প্রচার, ভুয়া সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট, এআই ব্যবহার করে এডিটেড আপত্তিকর ছবি প্রকাশ ও প্রচার এবং অনলাইন ব্ল্যাকমেইল।
সংকট মোকাবিলায় CSWC প্ল্যাটফর্ম ১৭টি ক্ষেত্রে ক্ষতিকর কনটেন্ট বা ভুয়া অ্যাকাউন্ট অপসারণে সরাসরি সহায়তা করেছে। এছাড়া ২১ জন ভুক্তভোগীকে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (BLAST)-এ আইনি সহায়তার জন্য, ৫ জনকে StopNCII.org-এ এবং ৪ জনকে পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন ইউনিটে রেফার করা হয়েছে। পাশাপাশি, ব্লাস্ট (BLAST)-এর প্রত্যক্ষ আইনি সহায়তা কার্যক্রমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত প্রধান কার্যালয়সহ বিভিন্ন শাখা ও হেল্পলাইনের মাধ্যমে মোট ২৫টি সাইবার-সংক্রান্ত আইনি পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে (যার মধ্যে ২১ জন নারী) এবং আশুলিয়া থানায় ১টি মামলা দায়ের করতে সরাসরি সহায়তা করা হয়েছে এবং বর্তমানে সংশ্লিষ্ট আদালতে উক্ত মামলাটি পরিচালনা করার ক্ষেত্রে ব্লাস্ট এর পক্ষ থেকে বিনামূল্যে আইনগত সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের প্রতি সুনির্দিষ্ট আহ্বান:
‘সাইবার সচেতনতা মাস ২০২৬’ উপলক্ষে CSWC যৌথভাবে সরকারের প্রতি ৩টি সুনির্দিষ্ট দাবি জানাচ্ছে:
১. নতুন করে খসড়া: সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর প্রস্তাবিত সংশোধনী আইনে রুপান্তেরর পূর্বে পুনর্বিবেচনা করা হোক।
২. অংশীজনদের অন্তর্ভুক্তি: সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর সংশোধনীর পরবর্তী যেকোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যমকর্মী, আইনি বিশেষজ্ঞ, প্রযুক্তিবিদ এবং সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের অন্তর্ভুক্ত করে একটি অর্থপূর্ণ পরামর্শ গ্রহণ প্রক্রিয়া চালু করা হোক।
৩. আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিশ্চিতকরণ: আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের অধীনে বাংলাদেশের বাধ্যবাধকতাগুলোর সাথে সামঞ্জস্য রেখে এবং ব্যাপক আলোচনার ওপর ভিত্তি করে একটি সংশোধিত খসড়া তৈরি করা হোক, যা সাইবার স্পেসের বৃহত্তর উদ্বেগগুলো দূর করবে এবং নাগরিকদের ন্যায় বিচার নিশ্চিত করবে।
জনসাধারণের প্রতি আহ্বান:
CSWC-এর পক্ষ থেকে অক্টোবর মাসে সবাইকে নিজের ডিজিটাল নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন হওয়া, ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট সুরক্ষিত রাখা, সন্দেহজনক লিংকে ক্লিক না করা এবং সাইবার সহিংসতার শিকার হলে নীরব না থেকে প্রাসঙ্গিক ডিজিটাল প্রমাণ (স্ক্রিনশট/লিংক) সংরক্ষণ করে দ্রুত আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা নেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। বিশেষ করে শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অভিভাবকদের তাদের ডিজিটাল কার্যক্রম সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারে সহায়তা করা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তি অনলাইন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল, পরিচয় বা ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার কিংবা এআই-নির্ভর ভুয়া কনটেন্টের শিকার হলে প্রাসঙ্গিক ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ করে দ্রুত আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন।
CSWC এর পক্ষ থেকে অক্টোবর মাসে সকলকে নিজের ডিজিটাল নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন হওয়া, ব্যক্তিগত তথ্য ও অ্যাকাউন্ট সুরক্ষিত রাখা, সন্দেহজনক লিংক বা বার্তায় সতর্ক থাকা, যাচাই না করে কোনো কনটেন্ট শেয়ার না করা এবং সাইবার সহিংসতার ক্ষেত্রে নীরব না থেকে যথাযথ সহায়তা নেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন (CSWC) প্ল্যাটফর্ম:
সাইবার সহিংসতায় ভুক্তভোগীদের বিশেস করে নারী ও শিশুদের সুরক্ষায় সমন্বিতভাবে কাজ করতে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)-এর উদ্যোগে ১৭টি সংগঠনের সমন্বয়ে সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন (CSWC) প্ল্যাটফর্ম গঠিত হয়েছে। নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতা প্রতিরোধ, আইনি সহায়তা, ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতে প্ল্যাটফর্মটি সম্মিলিতভাবে কাজ করছে। প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), যুগ্ম আহ্বায়ক সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন (সিক্যাফ) এবং সদস্য সচিব নারীপক্ষ। এছাড়া আরও ১৪টি সদস্য সংগঠনের মধ্যে রয়েছে—আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), অরোধ্য ফাউন্ডেশন, আর্টিকেল নাইনটিন, ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেটিক্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইআইডি), দ্য টেক একাডেমি, বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটিজ, ব্র্যাক, বাংলাদেশ ইন্টারনেট গভর্নেন্স ফোরাম (বিআইজিএফ), বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, ভয়েজ, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, সাইবার টিনস, ডিজিটালি রাইট লিমিটেড এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।
বার্তা প্রেরক:
Cyber Support for Women and Children-CSWC এর সচিবালয়- এর পক্ষে
কমিউনিকেশন বিভাগ, ব্লাস্ট
ই-মেইল: communication@blast.org.bd
আরও তথ্যের জন্য যোগাযোগ করুন:
এডভোকেট মনীষা বিশ্বাস
লিগ্যাল স্পেশালিষ্ট, ব্লাস্ট এবং ফোকাল পারসন- Cyber Support for Women and Children-CSWC
ই-মেইল: platform.vaw@gmail.com
