২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর সহিংসতায় দ্রুত বিচার, ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ এবং মাজার ও দরগাহ্ পুনর্নির্মাণের দাবি মানবাধিকার কর্মীদের

জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনসহ বিভিন্ন সূত্রে নথিভুক্ত সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর সহিংসতা এবং মাজার ও দরগাহে হামলার ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে দ্রুত ও কার্যকর তদন্ত ও বিচার নিশ্চিতে সরকারের প্রতি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন মানবাধিকারকর্মীরা। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ময়মনসিংহের দীপু চন্দ্র দাসের ঘটনা, যশোরের অভয়নগরে হামলার ঘটনা, রূপলাল হত্যাকাণ্ড, এবং দেশব্যাপী মাজার, দরগাহ, ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলার ঘটনা।

বক্তারা দীর্ঘমেয়াদী সহায়তা এবং ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের জন্য কর্মসংস্থান ও শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিতের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এছাড়াও সহিংসতা প্রতিরোধ, কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করা এবং ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিতের ক্ষেত্রে তাদের দাবিগুলো বিবেচনার জন্য গুরুত্বারোপ করেন। এছাড়াও বক্তারা সহিংসতার ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং একটি পৃথক কমিশন গঠনের দাবি জানান।

আজ রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায়, রংপুরে গণপিটুনিতে নিহত রূপলাল চন্দ্রের ছেলে শ্রী জয় চন্দ্র তাঁদের জীবিকা নির্বাহের চরম সংকটের কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, তাঁর বাবার হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ১৩ মাস পেরিয়ে গেলেও ন্যায়বিচার এখনো নিশ্চিত হয়নি, এবং অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে পরিবারের পুনর্বাসনের জন্য প্রদত্ত প্রতিশ্রুতিগুলোও এখনো বাস্তবায়িত হয়নি, যা তাদের জীবিকা নিশ্চিত করতে অত্যন্ত জরুরি। বাবার হত্যাকাণ্ডের পর পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতে হওয়ায় তিনি নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারছেন না। ময়মনসিংহের দীপু চন্দ্র দাসের স্ত্রী মেঘনা দাস বলেন, “আমার স্বামীর হত্যার এক বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো আমরা তার হত্যার বিচার পাইনি। সরকারের পক্ষ থেকে আমাকে চাকরিসহ বাড়ি বানিয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও তার কোনোটিই বাস্তবায়ন হয়নি”। যশোরের অভয়নগর হামলার একজন ভুক্তভোগী পান্না বিশ্বাস তাদের বসতবাড়ির বিপন্ন অবস্থার বিবরণ দেন ও বলেন যে, “আমরা চাই আমাদের বাড়িঘরগুলো ঠিক করে দেয়া হোক। আমাদের উপার্জন করে খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়া হোক। আপনাদের সকলের কাছে এই মিনতি যেন আপনারা আমাদের পাশে দাঁড়ান, আমরা বেচে থাকার মত অবস্থায় ফিরে যেতে চাই।”

সেন্টার ফর ইসলামিক হেরিটেজ-এর ইমরান হোসেন জানান, এ পর্যন্ত ১০৩টি মাজারে হামলা হয়েছে, ৫০টি মাজারে উরস উদযাপন বন্ধ হয়ে গেছে, ১৮টি মাজার সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে, এবং এসকল হামলার ঘটনায় ৩ জন নিহত হয়েছেন। এর পাশাপাশি তিনি মাজারে হামলাকারীদের পক্ষে রাজনীতিবিদদের বক্তব্য দেওয়া নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, অধিকাংশ হামলার পেছনে মূলত জমি দখল ও অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত এবং রাজনৈতিক ‘ট্যাগিং’ ব্যবহার করে এসব হামলাকে বৈধতা দেওয়ার নিন্দা জানান। এছাড়া, উরস শরিফ, মিলাদ, এমনকি ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপনেও বারবার হুমকি ও বন্ধের ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বিচারের প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ নিয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নূর খান লিটন বলেন, “অধিকাংশ মামলা তদন্তাধীন রয়ে গেছে বা কোনো আইনি প্রক্রিয়াই শুরু হয়নি।” তিনি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর সহিংসতার ঘটনাগুলোর আরও পদ্ধতিগত নথিভুক্তকরণ প্রক্রিয়ায় আহ্বান জানান। একইসঙ্গে তিনি সুফি ও বাউল সম্প্রদায়সহ সকল ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের রীতিনীতি উদযাপনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও অধিকার রক্ষায় সব পক্ষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।

এডভোকেট দিলরুবা রহমান বলেন, “যেসব মামলায় অজ্ঞাতনামা উল্লেখ থাকে সেসকল মামলায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অনেক নির্দোষ ব্যক্তিকে আটক করে রাখা হয় আর দোষীরা জামিন পেয়ে যায়। বছর পেরিয়ে গেলেও এসকল মামলার এজাহার বা সুষ্ঠু তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায় না।” তিনি সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে হুমকির মামলায় জামিন প্রদানের ক্ষেত্রে শর্ত আরোপের প্রয়োজনীয়তা, ভুক্তভোগী ও অভিযুক্ত উভয়ের জন্য আইনি সহায়তা নিশ্চিতকরণ, এবং কোনো ব্যক্তি যেন আইনি প্রতিনিধিত্ব ছাড়া না থাকেন তা নিশ্চিতে আইনজীবীদের দায়িত্বের কথাও তুলে ধরেন।

ভুক্তভোগী-কেন্দ্রিক বিচার ব্যবস্থা ও ক্ষতিপূরণ প্রসঙ্গে প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম, সকলের, বিশেষত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানবিক মর্যাদা ও মানবাধিকারকে কেন্দ্রে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গীকার গ্রহণের আহ্বান জানান। তিনি মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার ভুক্তভোগীদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ও স্থায়ী ‘ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নীতিমালা’ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. কাজী জাহেদ ইকবাল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভুক্তভোগী সংশ্লিষ্ট সহিংসতার মামলাগুলোর দ্রুত বিচার নিশ্চিতের আহ্বান জানান, পাশাপাশি পুলিশ ও প্রসিকিউশনের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি এবং তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে ভুক্তভোগী ও পরিবারের সঙ্গে আরও ভালো যোগাযোগের আহ্বান জানান।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বদিউজ্জামান তপাদার সহিংসতার মূল কারণ চিহ্নিত করতে একটি স্বতন্ত্র তদন্ত কমিশন গঠনের প্রস্তাব দেন। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য একটি নিরাপত্তা ও সুরক্ষা মঞ্চ গঠন করার সুপারিশ করেন, নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন।

এসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম এন্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি) এর নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা একটি স্থায়ী কমিশনের সুপারিশ প্রদান করেন, যা শুধুমাত্র সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দেখাশোনাই করবে না, হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতাও রাখবে প্রশাসনের মাধ্যমে।

নারীপক্ষ-এর প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী এবং নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন এর চেয়ারপারসন শিরীন পারভিন হক তার বক্তব্যে তুলে ধরেন যে, জুলাই গণভ্যত্থানে মেয়েদের যে উপস্থিতি ছিল পরবর্তী সময়ে তা আর দেখা যায়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারেও শিক্ষার্থী প্রতিনিধি যে দুজন কে নেওয়া হয়, দুইজনই পুরুষ। এক্ষেত্রে নারীরাও প্রান্তিকতার শিকার।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য মেঘনা গুহঠাকুরতা তার উপস্থাপনয় সুপারিশ করেন যে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জন্য একটি ‘আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা’ (Early Warning System) করা উচিত, যেখানে মসজিদ বা অন্যান্য সামাজিক স্থান থেকে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর মতো ঘোষণা, বিপুল সংখ্যক যানবাহন ভাড়া করা এবং পেট্রোল ও কেমিক্যালের মতো সম্ভাব্য অস্ত্রের ক্রয় বা চুরিকে সহিংসতার লক্ষণ হিসেবে গণ্য করা হবে।

সমাপনী বক্তব্যে ব্লাস্ট-এর অনারারি নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন বলেন, “জুলাই পরবর্তী সহিংসতার বিষয়ে কেবল জাতিসংঘের প্রতিবেদন মিললেও রাষ্ট্রীয় কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। এমনকি প্রযুক্তি ও মুঠোফোনের যুগেও রূপলাল হত্যা ও মাজার ভাঙচুরের তদন্ত প্রতিবেদন এখনও মেলেনি।” তিনি ‘অজ্ঞাতনামা আসামির’ ঔপনিবেশিক চর্চাকে হয়রানির হাতিয়ার হিসেবে উল্লেখ করেন। এ সময় ঘটনা ঘটার আগেই ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়াতে একটি কার্যকর ‘পূর্ব সতর্কীকরণ ব্যবস্থা’ গড়ার ওপর জোর দেন।

প্রেক্ষাপট: জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত জুলাই অভ্যুত্থানের সময় ও তার ঠিক পরবর্তী সময়ে সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র উঠে এসেছে। বিক্ষোভকারী ও সাধারণ মানুষের ওপর হামলা, নির্বিচার গ্রেপ্তার ও আটক (ব্লক রেইডসহ), নির্যাতন ও যৌন সহিংসতা এবং ডিজিটাল নিপীড়নের পাশাপাশি ৫ই আগস্টের পর আহমদীয়া ও হিন্দু সম্প্রদায়সহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক গোষ্ঠীর ওপর সংঘটিত সহিংসতার ঘটনা এতে বিস্তারিতভাবে নথিভুক্ত করা হয়। এসব হামলায় প্রাণহানি, শারীরিক জখম এবং বসতবাড়ি, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান ও সুফি সম্প্রদায়ের মাজারসহ উপাসনা-কেন্দ্রের ক্ষতিসাধন ঘটে। মানবাধিকার কর্মী ও সংবাদমাধ্যম পরবর্তীতেও ধারাবাহিকভাবে এসব ঘটনা প্রকাশ করে আসছে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ সমূহ:

বার্তা প্রেরক:

কমিউনিকেশন বিভাগ, ব্লাস্ট

ই-মেইল: communication@blast.org.bd