০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ঢাকা, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬: পুলিশ হেফাজতে ইশতিয়াক হোসেন জনির নির্যাতনজনিত মৃত্যুর ১৩ বছর পরও তার পরিবার চূড়ান্ত বিচার এবং আদালত কর্তৃক নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত রয়েছে। আজ, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩-এর অধীনে দেশের প্রথম ঐতিহাসিক রায়ের ছয় বছর পূর্ণ হচ্ছে। বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) জনির পরিবারের জন্য দ্রুত আপিল নিষ্পত্তি এবং অবিলম্বে আদালতের নির্দেশিত ক্ষতিপূরণ প্রদান নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছে।
২০১৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর পল্লবী এলাকায় একটি বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে জনি ও তার ভাই রকিকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। হেফাজতে তাদের ওপর শারীরিক নির্যাতনের একপর্যায়ে জনি মারা যান। পেশায় গাড়িচালক জনি রেখে যান তার মা, স্ত্রী, ১১ বছর বয়সী ছেলে ও ৮ বছর বয়সী মেয়ে এবং ছোট ভাই রকিকে।
জনির পরিবার থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ প্রথমে মামলা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়। পরবর্তীতে তার ভাই ইমতিয়াজ হোসেন রকি নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩-এর অধীনে মামলা দায়ের করেন। মামলার বিচারিক কার্যক্রম একপর্যায়ে স্থগিত হলেও ব্লাস্টের আইনি সহায়তায় হাইকোর্ট সেই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে ছয় মাসের মধ্যে বিচার শেষ করার নির্দেশ দেন।
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার পর ৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ সালে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত আইনটির অধীনে দেশের প্রথম ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন। আদালত পুলিশের এসআই জাহিদুর রহমান, এএসআই রাশেদুল হাসান এবং এএসআই মোঃ কামরুজ্জামান মিন্টুকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন এবং প্রত্যেককে জনির পরিবারকে ২ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ প্রদানের নির্দেশ দেন। দুই পুলিশ সোর্স সুমন ও রাসেলকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে আসামিদের আপিলের প্রেক্ষিতে ১১ আগস্ট ২০২৫ হাইকোর্ট বিভাগ রায় প্রদান করেন। আদালত এসআই জাহিদুর রহমানের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং তার বিরুদ্ধে ১ লাখ টাকা জরিমানা ও জনির পরিবারকে ২ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের আদেশ বহাল রাখেন। পলাতক এএসআই কামরুজ্জামান মিন্টুর বিরুদ্ধে নিম্ন আদালতের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, জরিমানা ও ২ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের আদেশও বহাল থাকে। এএসআই রাশেদুল হাসানের সাজা কমিয়ে ১০ বছর এবং জরিমানা ও ক্ষতিপূরণ যথাক্রমে ৫০ হাজার ও ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। অপরদিকে, পুলিশ সোর্স রাসেলকে খালাস দেওয়া হয়। অপর সোর্স সুমন ইতোমধ্যে তার সাজা ভোগ করেছেন।
তবে এই রায়ও এখনো চূড়ান্ত নয়। সরকারের পক্ষ থেকে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে কোনো আপিল করা হয়নি। জনির ভাই রকির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্লাস্ট রাসেলের খালাসের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে ক্রিমিনাল পিটিশন ফর লিভ টু আপিল নং ১১৮২/২০২৬ দায়ের করেছে, যা বর্তমানে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
সাজাপ্রাপ্ত সকল ব্যক্তি বর্তমানে হেফাজতে নেই; এএসআই কামরুজ্জামান মিন্টু পলাতক রয়েছেন। পুলিশ সোর্স রাসেল হাইকোর্টে খালাস পেয়েছেন এবং সুমন তার সাজা ইতোমধ্যে ভোগ করেছেন। ফলে ১৩ বছর আগে হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় দায়ীদের জবাবদিহি এবং বিচারিক প্রতিকারের প্রশ্ন এখনো সম্পূর্ণভাবে নিষ্পত্তি হয়নি।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বিভিন্ন আদালতের রায়ে জনির পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার স্পষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও পরিবার আজ পর্যন্ত কোনো ক্ষতিপূরণ পায়নি, যেহেতু মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কোন বিধান নেই। একজন নিহত ব্যক্তির পরিবারকে দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে বিচার, জবাবদিহি ও প্রতিকারের অপেক্ষায় রাখা আইনের শাসন ও মানবাধিকারের প্রতি গুরুতর অবমাননা।
ব্লাস্ট তাই—
১। জনির পরিবারের দায়ের করা আপিল দ্রুত শুনানি ও নিষ্পত্তির দাবি জানাচ্ছে;
2। পলাতক আসামি এএসআই কামরুজ্জামান মিন্টুকে গ্রেপ্তার করে সাজা কার্যকর করার দাবি জানাচ্ছে; এবং
৪। আদালত কর্তৃক নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ অবিলম্বে জনির পরিবারকে প্রদান নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছে।
জনির মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়; এটি পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আইনি সুরক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও।
বার্তা প্রেরক:
মুশফিকুর রহমান মারুফ,
সমন্বয়কারী- কমিউনিকেশন, ব্লাস্ট
মোবাইল: ০১৫৫২-৩২৪৩৭৬;
ই-মেইল: communication@blast.org.bd
প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন:
বনরূপা রায়, স্টাফ ল’ইয়ার, ব্লাস্ট
মোবাইল: ০১৭৭৬-৬০১৪৫১
গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ সমূহ:
- এক যুগেও আইনি লড়াই শেষ হয়নি (দৈনিক সমকাল, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬)
- Custodial Death Cases: Path to justice long and arduous (The Daily Star, 10 September 2026)
