০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিচারপ্রাপ্তি সহজ করতে ভার্চুয়াল শুনানি কার্যক্রম চালু

রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিচারপ্রাপ্তি আরও সহজ, নিরাপদ ও কার্যকর করতে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) ও জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা UNHCR আজ উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প 2W-এ একটি ভার্চুয়াল শুনানি কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করেছে। আদালতে দীর্ঘ যাতায়াত, নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি, চেকপোস্টে বিলম্ব, চলাচলের সীমাবদ্ধতা এবং ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের সশরীরে আদালতে উপস্থিতি সংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা কমানোর জন্য এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ক্যাম্প 2W-এ দূরবর্তী শুনানি কেন্দ্রের কার্যক্রম প্রদর্শন ও উপকারভোগীদের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের পর কার্যক্রমটির উদ্বোধন করা হয়। একই দিন বিকেলে কক্সবাজারের সায়মান বিচ রিসোর্টের মারিনা হলে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিচারপ্রাপ্তি ও সুরক্ষা বিষয়ে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বিচার বিভাগ, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার-RRRC, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তর, ১৪ এপিবিএন, কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতি, UNHCR, ব্লাস্ট এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আলোচনায় আদালত, আইনগত সহায়তা প্রদান অধিদপ্তর, সুরক্ষা সেবা, ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বয়, কার্যকর যোগাযোগ ও দ্রুত রেফারেল ব্যবস্থা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

কক্সবাজার জেলা আদালত থেকে উখিয়ার দূরত্ব ৩৫ কিলোমিটার এবং টেকনাফের ৭৪ কিলোমিটার; উখিয়া ও টেকনাফে কোনো চৌকি আদালত নেই। ভার্চুয়াল শুনানি রোহিঙ্গা শরণার্থী ও উখিয়া-টেকনাফের দূরবর্তী এলাকার মানুষের আদালতে যাতায়াতের প্রয়োজন ও সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি কমাতে পারে। বিশেষ করে নারী, সহিংসতার শিকার ব্যক্তি, শিশু, বয়স্ক, প্রতিবন্ধী এবং বিশেষ সুরক্ষার প্রয়োজন রয়েছে এমন মানুষের জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে বিচারপ্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে পারে।

প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর বিচারপ্রাপ্তি সহজ করতে ভার্চুয়াল শুনানির গুরুত্ব এবং আইনগত সহায়তা, সুরক্ষা সেবা ও বিচারব্যবস্থার সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি ও BLAST-এর প্রধান আইন উপদেষ্টা মাননীয় বিচারপতি বোরহানউদ্দিন বলেন, “ভার্চুয়াল শুনানি প্রচলিত বিচারব্যবস্থার বিকল্প নয়; বরং বিশেষ করে প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য বিচারপ্রাপ্তি আরও সহজ ও কার্যকর করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এ ধরনের উদ্যোগকে টেকসই করতে আইনগত সহায়তা, সুরক্ষা সেবা, আদালত ও প্রযুক্তির মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করা অপরিহার্য।”

প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, নিরাপদ ডিজিটাল অবকাঠামো এবং বিচারিক কার্যক্রমের গোপনীয়তা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, “ভার্চুয়াল শুনানির কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য বিচারক, আইনজীবী ও আদালত কর্মকর্তাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, নিরাপদ ডিজিটাল অবকাঠামো নিশ্চিত করা এবং বিচারিক কার্যক্রমের গোপনীয়তা ও ন্যায্যতা বজায় রাখা জরুরি। ধাপে ধাপে ই-জুডিশিয়ারি ব্যবস্থার সম্প্রসারণ বিচারপ্রাপ্তির বিদ্যমান বাধা কমাতে এবং বিচারসেবা আরও সহজলভ্য করতে সহায়তা করতে পারে।”

স্পষ্ট নীতিমালা ও SOP প্রণয়ন, ডিজিটাল প্রমাণ ব্যবহারের উপযুক্ত আইনি কাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. খাদেম উল কায়েস বলেন, “ভার্চুয়াল শুনানির কার্যকর ও টেকসই বাস্তবায়নের জন্য স্পষ্ট নীতিমালা ও Standard Operating Procedures (SOPs), ডিজিটাল প্রমাণ ব্যবহারের উপযুক্ত আইনি কাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট বিচারিক ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় অপরিহার্য।”

রোহিঙ্গা শরণার্থীসহ প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত বিচারপ্রার্থীদের আইনগত সহায়তা ব্যবস্থার আওতায় আনা এবং কার্যকর রেফারেল ও সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করে বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তর -এর মহাপরিচালক মো. মঞ্জুরুল হোসেন বলেন, “ক্যাম্প, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আইনগত সহায়তা প্রদানকারী সংস্থা ও আদালতের মধ্যে কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নারী, শিশু ও বিশেষ সুরক্ষা প্রয়োজন এমন ব্যক্তিদের জন্য বিশেষায়িত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আইনগতভাবে আপসযোগ্য বিরোধে প্রশিক্ষিত মধ্যস্থতার সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে; তবে গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক বিচারব্যবস্থাই কার্যকর থাকতে হবে।”

বিচারব্যবস্থায় মামলার জট এবং দূরবর্তী এলাকার বিচারপ্রার্থীদের ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতার কথা উল্লেখ করে কক্সবাজারের সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ আবদুর রহিম বলেন, “উখিয়া-টেকনাফসহ দূরবর্তী এলাকার বিচারপ্রার্থীদের ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা বিচারপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এ পরিস্থিতিতে ভার্চুয়াল শুনানির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দূরবর্তী এলাকায় বিচারসেবা আরও সহজলভ্য করার উদ্যোগ বিচারপ্রাপ্তির বাধা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।”

বাংলাদেশে UNHCR-এর প্রতিনিধি ইভো ফ্রেইজেন বলেন, “বিচারপ্রাপ্তি সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দূরত্ব, নিরাপত্তাহীনতা বা অন্যান্য বাস্তব বাধার কারণে কোনো শরণার্থী বা দূরবর্তী এলাকার মানুষ অবিচারের শিকার হবে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। নিরাপদ, গোপনীয় ও সবার জন্য সহজলভ্য উপায়ে এবং প্রচলিত বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় রেখে প্রযুক্তির ব্যবহার এসব বাধা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।”

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান সভার সমাপনী বক্তব্যে প্রদান করেন। ব্লাস্ট-এর উপদেষ্টা আহমাদ ইব্রাহীমের সঞ্চালনায় উক্ত সভার উদ্দেশ্য তুলে ধরেন ব্লাস্ট-এর পরিচালক (আইন) মো. বরকত আলী।

প্রেক্ষাপট:

২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে জেলা বিচার বিভাগ, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয় (RRRC), আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (APBn), জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (UNHCR) এবং বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)- এর প্রতিনিধিরা রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করে শরণার্থীদের আদালতে বিচারপ্রাপ্তির প্রধান সমস্যাগুলো সম্পর্কে প্রতিকারের পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করেন। পরবর্তী সময়ে বিচার বিভাগ, RRRC, সরকারি কৌঁসুলি, সংশ্লিষ্ট আইনজীবী, UNHCR, BRAC ও BLAST- এর অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত আলোচনায় ভার্চুয়াল শুনানি, সম্ভাব্য চৌকি আদালত, সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য সিআইসি কার্যালয়কে নিরাপদ স্থান হিসেবে ব্যবহার এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ২০৫ ধারায় শরণার্থীদের স্বশরীরে উপস্থিতি থেকে অব্যাহতি দেওয়া নিয়ে আলোচনা হয়।

২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত একটি জাতীয় পর্যায়ের কর্মশালায়ও উখিয়া-টেকনাফে ভার্চুয়াল শুনানি এবং আদালত ও আইনগত সহায়তা সেবা আরও সহজলভ্য করার বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। ২০২৬ সালে BLAST ও UNHCR এসব আলোচনা থেকে বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যায়। কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ এবং চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট উখিয়া-টেকনাফ ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৩- এর মাধ্যমে কার্যক্রমটি পরীক্ষামূলকভাবে চালুর বিষয়ে সম্মতি দেন। ১৭ জুন ২০২৬ তারিখে UNHCR, BLAST ও RRRC- এর ত্রিপক্ষীয় সমন্বয় সভায় শিবির ভিত্তিক দূরবর্তী শুনানি কেন্দ্র চালুর বিষয়ে ঐকমত্য হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২৮ জুলাই ২০২৬ সংশ্লিষ্ট আদালতের আদেশ অনুযায়ী একটি পরীক্ষামূলক ভার্চুয়াল শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। চার বছর ধরে ওয়ারেন্ট ও অভিযোগ গঠনের পর্যায়ে আটকে থাকা একটি মামলায় ওই শুনানিতে অভিযোগ গঠন সম্পন্ন হয়।

স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও এই কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ। উখিয়া ও টেকনাফের দূরবর্তী এলাকার মানুষ আদালতে না গিয়েও নির্দিষ্ট বিচারিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। এর ফলে স্থানীয় আদালতের ওপর চাপ কমাতেও সহায়তা করতে পারে।

২০১৯ সাল থেকে BLAST ১৭টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সংশ্লিষ্ট ৪৭৪টি মামলায় আইনগত সহায়তা দিয়েছে; এর মধ্যে ৮৩টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। ১০টি মামলা তিন বছরের বেশি সময় ধরে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে এবং এ পর্যায়ে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চলমান অমীমাংসিত মামলাটি সাত বছর ধরে চলমান। UNHCR-এর সহায়তায় BLAST ও BRAC রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আইনগত সহায়তা প্রদান করছে। এসব অভিজ্ঞতা বিচারপ্রাপ্তির বাধা চিহ্নিত করা এবং ভার্চুয়াল শুনানি কার্যক্রমের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সহায়তা করেছে।

বার্তা প্রেরক:

মুসফিকুর রহমান মারুফ, সমন্বয়কারী- কমিউনিকেশন, ব্লাস্ট

মোবাইল: ০১৫৫২-৩২৪৩৭৬; ই-মেইল: communication@blast.org.bd

প্রয়োজনে আরও তথ্যের জন্য যোগাযোগ করুন-

মানিক বিশ্বাস, সহকারী পরিচালক- প্রোগ্রাম, ব্লাস্ট। মোবাইল: ০১৭৬৮-৭৭৫০০৬

গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ সমূহ:

Bangla:

English: