২৫ আগস্ট, ২০২৬
১। প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে একটি কার্যকর, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রস্তাবিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬-এর খসড়া পর্যালোচনা এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত ও সুপারিশ গ্রহণের ভিত্তিতে ব্লাস্ট নিম্নোক্ত সুপারিশসমূহ উপস্থাপন করছে।
গত ১০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে মন্ত্রিসভা এই খসড়াটি অনুমোদন করেছে। এর আগে ২০২৬ সালের মে মাসে আরও একটি খসড়া প্রকাশ করা হয়েছিল (মে মাসের খসড়া)। এই খসড়া আইনে পরিণত না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯ বহাল রয়েছে। নির্বাচনের পর ২০২৫ সালের অধ্যাদেশটি সংসদে অনুমোদিত না হওয়ায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রণয়ন) আইন, ২০২৬-এর মাধ্যমে ২০০৯ সালের আইনটি পুনর্বহাল হয়।
২। উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তন
চূড়ান্ত খসড়ায় কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
কমিশনের স্বাধীনতা ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা
- ধারা ৩(২)-এ কমিশনকে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে;
- ধারা ৫(১)-এ কমিশনের সদস্যদের মধ্যে অন্তত একজন নারী থাকার বিধান যুক্ত করা হয়েছে;
- ধারা ৪০-এ প্রবিধান প্রণয়নের ক্ষমতা সরকারের পরিবর্তে কমিশনের হাতে অর্পণ করা হয়েছে;
- ধারা ৩০(৩)-এ কর্মকর্তা-কর্মচারীর চাকরির শর্তাবলি কমিশনের প্রবিধানে নির্ধারণের বিধান রাখা হয়েছে।
অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা
- ধারা ১৯(৪)-এ শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগের ক্ষেত্রে সেই বাহিনীর নিজস্ব তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমা ছয় মাস থেকে ৪৫ দিনে কমানো হয়েছে, এবং সেই বাহিনীর গৃহীত ব্যবস্থা সন্তোষজনক না হলে কমিশনের স্বপ্রণোদিত কার্যক্রম গ্রহণের সুযোগ যুক্ত হয়েছে;
- ধারা ৩৯-এ স্বার্থের সংঘাত সংক্রান্ত একটি নতুন বিধান সংযোজিত হয়েছে।
৩। উদ্বেগ
কমিশনের স্বাধীনতা ও অন্তর্ভুক্তি, তদন্ত ও পরিদর্শনের ক্ষমতা, প্রতিকার প্রদানের সক্ষমতা এবং সংসদের নিকট জবাবদিহির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ রয়ে গেছে। নিম্নোক্ত সুপারিশসমূহ সেই উদ্বেগগুলো নিরসনের লক্ষ্যে উপস্থাপন করা হলো।
৪। সুপারিশসমূহ
কমিশনের স্বাধীনতা ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা
৪.১. নারী ও সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব বাধ্যতামূলক করা
- কমিশনের সদস্যদের মধ্যে অন্তত একজন নারী থাকার বিধান যুক্ত করা হয়েছে, যদিও নাগরিক সমাজের দাবি ছিল কমপক্ষে ২ জন নারী সদস্য। তাছাড়া অন্য বৈচিত্রের প্রতিনিধিত্ব সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়েছে।
- ধারা ৫(৩) সংশোধন করে “যোগ্য প্রার্থী থাকিলে অগ্রাধিকারভিত্তিক বিবেচনা” শর্তটি প্রত্যাহার করা। কমিশনের অন্য কোনো সদস্যের ক্ষেত্রে এ ধরনের শর্ত আরোপ করা হয়নি; কেবল এই একটি ক্ষেত্রেই তা আরোপ করা বৈষম্যমূলক।
- আদিবাসী জনগোষ্ঠী থেকে অন্তত একজন কমিশনার এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীসমূহ (যেমন দলিত সম্প্রদায় বা প্রতিবন্ধী ব্যক্তি) বা সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী (ধর্মীয়, ভাষাগত বা জাতিগত সংখ্যালঘু) থেকে অন্তত একজন কমিশনারের অন্তর্ভুক্তি বাধ্যতামূলক করা।
৪.২. বাছাই কমিটির গঠন পরিবর্তন করা
- ধারা ৭ সংশোধন করে দুইজন মন্ত্রী এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে বাছাই কমিটি থেকে বাদ দেওয়া, যাতে নির্বাহী বিভাগের আধিপত্য না থাকে। তাঁদের পরিবর্তে মানবাধিকার সুরক্ষায় অভিজ্ঞতাসম্পন্ন অবসরপ্রাপ্ত সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি অথবা সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা।
8.৩. আর্থিক ও কার্যকরী স্বাধীনতা নিশ্চিত করা
- ধারা ৩৫(১) সংশোধন করে ব্যয়ের ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমোদনের প্রয়োজনীয়তা বাদ দেওয়া এবং সংযুক্ত তহবিলের উপর দায়যুক্ত ব্যয় (charged expenditure) সংযোজন করা।
৪.৪ কমিশনকে সরকারের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা
- ধারা ৪ অনুযায়ী শাখা কার্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমোদনের বাধা বাদ দেওয়া।
- ধারা ৩(২)-এ “কমিশন সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের অধীন থাকিবে না” — এই বিধান সংযোজন করা।
৪.৫. জনবল ও সাংগঠনিক কাঠামোর ক্ষেত্রে স্বাধীনতা
- ধারা ৩০(২) সংশোধন করে সরকারের নির্বাহী বিভাগের অনুমোদন ছাড়াই কমিশনকে তার সাংগঠনিক কাঠামো ও জনবল নির্ধারণের পূর্ণ ক্ষমতা প্রদান করা।
৪.৬. সরকারি দপ্তর থেকে প্রেষণে নিয়োগ বন্ধ করা বা সীমিত করা
- ধারা ৩০(৪) সংশোধন করে সরকারি দপ্তর থেকে প্রেষণে কর্মকর্তা নিয়োগের ব্যবস্থা বাদ দেওয়া; অথবা কমিশনের মোট জনবলের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত সরকারি প্রেষণ সীমিত রাখা, যাতে প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়।
- কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে লিয়েন বা বিনা বেতনে ছুটি নিয়ে কমিশন সদস্য হওয়ার সুযোগ বাতিল করা।
অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা
৪.৭. শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধি
- ধারা ১৯ বাদ দেওয়া, যাতে পুলিশ, র্যাব, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও সশস্ত্র বাহিনীসহ সকল শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে আনীত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ স্বাধীনভাবে তদন্ত করার ক্ষমতা মানবাধিকার কমিশনকে স্পষ্টভাবে প্রদান করা হয়।
৪.৮. ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশের অজুহাত রোধে বিধান পুনর্বহাল
- মে মাসের খসড়া আইন -এ পূর্বে অন্তর্ভুক্ত ধারা ১৪ — ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ বা নির্দেশের অজুহাতে দায় এড়ানোর সুযোগ রোধ সংক্রান্ত বিধান — পুনর্বহাল করা।
৪.৯. মেডিকেল ও পোস্টমর্টেম প্রতিবেদন তলবের ক্ষমতা
- ধারা ২১(২) সংশোধন করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে কমিশনকে মেডিকেল ও পোস্টমর্টেম প্রতিবেদন তলব করার ক্ষমতা স্পষ্টভাবে প্রদান করা।
৪.১০. অভিযোগ দায়েরের তামাদি তুলে দেওয়া
- ধারা ১৪(খ)-এ অভিযোগ দায়েরের ছয় মাসের তামাদি তুলে দেওয়া।
৪.১১. নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের বাধ্যবাধকতা আরোপ
- ধারা ১৯(২)-এ শৃঙ্খলা বাহিনীকে ৪৫ দিনের সময়সীমা পরিবর্তন করে সর্বোচ্চ ৩০ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা। জরুরি ক্ষেত্রে — যেমন গুম, হেফাজতে মৃত্যু বা নির্যাতনের অভিযোগে — কমিশন যাতে সর্বোচ্চ ৭ দিনের মধ্যে জবাব চাইতে পারে, সে বিধান যুক্ত করা।
৪.১২. আটকস্থান পরিদর্শনে অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা বাদ দেওয়া
- ধারা ১৩(খ) সংশোধন করে কোনো সরকারি পূর্বানুমোদন ছাড়াই আটকস্থান, কারাগার, হাজতখানা, আটককেন্দ্র এবং কার্যালয়ে অঘোষিতভাবে পরিদর্শনের সুযোগ নিশ্চিত করা।
- ধারা ৩৩(৩)(ক)-তে পরিদর্শনযোগ্য স্থানের তালিকায় “সামরিক আটককেন্দ্র” পুনর্বহাল করা।
কমিশনের কার্যপরিধি ও আইনগত সংজ্ঞা সম্প্রসারণ
৪.১৩. মানবাধিকারের সংজ্ঞা সম্প্রসারণ
- ধারা ২(ঝ) সংশোধন করে মানবাধিকারের সংজ্ঞায় গোপনীয়তার অধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার, সমতার অধিকার এবং মানবিক মর্যাদার অধিকারের বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা। একই সঙ্গে খসড়ায় উল্লিখিত “বাংলাদেশে প্রচলিত আইনের সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রথাগত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন দ্বারা স্বীকৃত মানবাধিকার” অংশটি বাদ দেওয়া।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিকার শক্তিশালী করা
৪.১৪. মধ্যস্থতার ঢালাও বিধান সীমিত করা
- ধারা ১৭-এ উভয় পক্ষ সম্মত হলে মধ্যস্থতা/আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তির সুযোগ রাখা হয়েছে। আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা উচিত যে, নির্যাতন, যৌন সহিংসতা, গুম এবং হেফাজতে মৃত্যু-সহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো মধ্যস্থতা/আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা যাবে না।
৪.১৫. ক্ষতিপূরণ / আইনি সহায়তা অন্তর্ভুক্ত করা
- ধারা ১৬(৫)(খ) ও ধারা ১৮ সংশোধন করে মানবাধিকার কমিশনকে যে কোনো ব্যক্তি, কর্তৃপক্ষ বা সংস্থার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ও অন্তর্বর্তী উভয় ধরনের আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদানের ক্ষমতা স্পষ্টভাবে প্রদান করা।
- ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ ও প্রদানের ক্ষেত্রে অনুসরণীয় পদ্ধতি এবং ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নিরূপণের সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড সম্পর্কে আইনে সুস্পষ্ট বিধান অন্তর্ভুক্ত করা।
- ধারা ১৮ সংশোধন করে চলমান (continuing) মানবাধিকার লঙ্ঘন, সাক্ষীকে ভয়ভীতি প্রদর্শন অথবা কমিশনের কার্যক্রমে বাধা প্রতিরোধে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নিষেধাজ্ঞামূলক আদেশ (injunction) জারির ক্ষমতা প্রদান করা।
- ভুক্তভোগীকে আইনি সহায়তা প্রদানের ক্ষমতা (মে মাসের খসড়ার ধারা ১৩(চ)) পুনর্বহাল করা।
কমিশনের ক্ষমতাকে তদারকি প্রতিষ্ঠানের চরিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা
৪.১৬. জরুরি ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ
- ধারা ১৫(১)-এ সংযোজন করা যে, তদন্তের ক্ষেত্রে পরিস্থিতির গুরুত্ব ও জরুরিতা বিবেচনায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
৪.১৭. তদন্ত কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তারের ক্ষমতা বাদ দেওয়া
- ধারা ১৫(৫) বাদ দেওয়া, যেখানে মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তারের ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। একটি তদারকি প্রতিষ্ঠানের হাতে পুলিশি ক্ষমতা থাকা তার চরিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
১৮. আইনি দায়মুক্তির বিধান
- ধারা ৩৮-এর ফৌজদারি আদালত অবমাননাসংক্রান্ত বিধানের পরিবর্তে একটি “সৎ বিশ্বাসে কার্যসম্পাদন” (good faith) সুরক্ষা বিধান প্রণয়ন করা, যাতে মানবাধিকার কমিশনের সদস্য ও কর্মকর্তারা তাঁদের দায়িত্ব পালনের কারণে ব্যক্তিগত দেওয়ানি বা ফৌজদারি দায়ের সম্মুখীন না হন। ভারতের Protection of Human Rights Act, 1993-এর ধারা ৩৫-এ অনুরূপ সুরক্ষার বিধান রয়েছে।
প্রতিবেদন দাখিল ও জবাবদিহি
১৯. বার্ষিক প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপন
- ধারা ২৫ সংশোধন করে ৩০ দিনের মধ্যে স্পিকারের মাধ্যমে কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপনের বিধান রাখা।
*****
