২৪ অগাস্ট ২০২৬

সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

স্বাধীন ও কার্যকরী জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠনের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক বাছাই কমিটি অনিবার্য

 

বাংলাদেশে একটি কার্যকর, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রস্তাবিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬-এর খসড়া নিয়ে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত গ্রহণ, পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়নের উদ্দেশ্যে ব্লাস্ট ২৪ আগস্ট ২০২৬, জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করে।

সভায় প্রস্তাবিত আইনের বিভিন্ন দিক, বিশেষ করে কমিশনের স্বাধীনতা, কার্যকারিতা, জবাবদিহিতা, গঠন ও বাছাই কমিটি, আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা, অভিযোগ ব্যবস্থাপনা, তদন্ত, নিষ্পত্তি এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় এর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়। সভায় খসড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬-এর ওপর ব্লাস্টের পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয় এবং প্রস্তাবিত আইনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সংযোজনের বিষয়ে মতামত ও সুপারিশ গ্রহণ করা হয়।

প্রস্তাবিত খসড়ায় কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আনা হলেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ রয়ে গেছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ বা নির্দেশের অজুহাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায় এড়ানোর সুযোগ রোধে গুরুত্বপূর্ণ বিধানটি বাদ দেওয়া হয়েছে। শৃঙ্খলা বাহিনী বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কিছু ইতিবাচক সংশোধন আনা হলেও প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা এবং ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান আরও স্পষ্ট করা প্রয়োজন। পরিদর্শনের ক্ষেত্রে যথাযথ কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদনের নতুন শর্ত কমিশনের স্বাধীন তদন্ত ও পরিদর্শন ক্ষমতার সঙ্গে অসামঞ্জস্য সৃষ্টি করেছে।

একইসঙ্গে, কমিশনকে নিজস্ব প্রবিধান ও চাকরির শর্ত নির্ধারণের ক্ষমতা দেওয়া হলেও সাংগঠনিক কাঠামো এবং প্রেষণে নিয়োগে সরকারের নিয়ন্ত্রণ কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতাকে সীমিত করতে পারে। এছাড়া NPM-এর মর্যাদা ‘Division’ থেকে ‘Unit’-এ নামানো, সামরিক আটককেন্দ্রকে পরিদর্শনযোগ্য স্থানের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া এবং পৃথক ও সুরক্ষিত বাজেটের পরিবর্তে সাধারণ বরাদ্দের ওপর নির্ভরশীলতা NPM-এর স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা দুর্বল করতে পারে।

কমিশন নিয়োগে বাছাই কমিটির গঠন কেমন হওয়া উচিত—এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “বর্তমান বাছাই কমিটির কাঠামোতে চেয়ারম্যানসহ মোট আটজন সদস্যের মধ্যে ছয়জনই সরকারের দ্বারা নিয়োগপ্রাপ্ত। এই কাঠামো আমাদের আশ্বস্ত করে না যে, এর মাধ্যমে একটি স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠিত হবে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।”

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা প্রসঙ্গে নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন বলেন, “বর্তমানে আমরা লক্ষ্য করছি, ২০২৫-এর খসড়ার কিছু বিষয় পরিবর্তনের নামে যেন পুরো একটি উল্টো পথে চলে যাচ্ছি। স্বাধীন কমিশনের নামে এখন আমরা আসলে এখানে যা দেখছি, তা খুবই অস্বচ্ছ। শুধু মাত্র স্বাধীন বললেই তো একটি কমিশন স্বাধীন হয়ে যাচ্ছে না। আর্থিক বিষয়ে একটি বার্ষিক নীতিমালা মেনে একটি বাজেট স্বচ্ছতার সঙ্গে দেওয়া উচিত বলে মনে করি।” কমিশনের নামে আলাদা তহবিল কেন করা হলো, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি এবং বলেন, এই তহবিলের কারণে যে কোনো সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণকারী এক বক্তা ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ শব্দবন্ধ ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এবং ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহারের সুপারিশ জানান।

নূর খান লিটন, মানবাধিকার কর্মী ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের প্রাক্তন সদস্য, বলেন, “যেখানে তদন্তের পূর্বে যদি সরকারের অনুমতির জন্য অপেক্ষা করতে হয় বা সরকারের নির্দেশের অপেক্ষা করা লাগে, সেখানে তদন্তের কোনো প্রয়োজন নেই। গুম, খুন কিংবা এই ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে যদি সরকারের অনুমতি লাগে প্রতিবার, সেক্ষেত্রে কতটুকু নিরপেক্ষ থাকা যাচ্ছে, সেই প্রশ্ন উঠতে পারে।”

মোঃ জারিফ রহমান, গবেষণা পরিচালক, সপ্রান, বলেন, “আমরা যদি আমাদের প্রেক্ষাপটে ফিরে যাই, আমরা দেখতে পাই, গত ১৫ বছরে রাষ্ট্র ও নাগরিকের যে দূরত্ব, তা একটি প্রধান অস্ত্র। যার ফলে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর দ্বারা এসব গুম, খুন সংঘটিত হয়েছে। আমরা যদি ১৯তম ধারার ১ উপধারায় দেখতে পাই, যেন কিছুই পরিবর্তন হচ্ছে না। আগের আমাদের যে ক্ষত, তা যেন এই ধারা বয়ে বেড়াচ্ছে। প্রতিবেদন দাখিলের কোনো সময়সীমা বেঁধে দেওয়া নেই, এমনকি প্রতিবেদনের পরবর্তী কার্যক্রমের জন্যও কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি। যে বাহিনীর কাছ থেকে আমরা রিপোর্ট চাচ্ছি, তার নিজের কোনো সংস্কার আমরা করিনি। এখন থেকে আমরা কীভাবে সূক্ষ্ম ও সুষ্ঠু তদন্ত প্রতিবেদন পেতে পারি?”—এ প্রশ্ন রেখে যান বক্তা।

মুক্ত আলোচনায় অপর এক বক্তা বলেন, “এই কমিশনে যেন কোনো কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট না আসে। আইনটি যেন একটি সুপরিকল্পিত প্রতারণামূলক আইন।” আরেক বক্তা বলেন, “ঢাকার বাইরে থেকে আসা বিচারপ্রার্থীদের জন্য যাওয়া-আসা এবং থাকার ব্যবস্থা থাকলে সুবিধা হতো। সেক্ষেত্রে তহবিল সাহায্য করবে বলে তিনি মনে করেন।”

 

ভাষ্কর ভট্টাচার্য, ইনক্লুশন অ্যাডভাইজার, ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশন (YPSA), বলেন, “মানবাধিকারের কোনো নির্দেশনা যদি না মানা হয়, তাহলে আমরা কোথায় যাব?” অনুপম দেবাশীষ রায়, লেখক ও গবেষক, বলেন, “এই খসড়াটি হচ্ছে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর অতিনির্ভরতার একটি প্রতিচ্ছবি। পাঁচজন সদস্যের মধ্যে তিনজন থাকলে কোরাম গঠন হবে। এখন একজন নারী ও একজন নৃগোষ্ঠীর সদস্য যদি না থাকেন, তাহলেও তো কোরাম হয়ে যাচ্ছে। তাহলে লাভ কী হচ্ছে?”—প্রশ্ন করেন তিনি।

সতেজ চাকমা, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরাম, বলেন, ২০২৪ সালের পর ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ শব্দটি থাকা কতটা যুক্তিসংগত, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ২০০৯ সালের আইনে বলা হয়েছে, কমপক্ষে একজন নারী ও একজন নৃগোষ্ঠীর ব্যক্তি থাকবেন। কিন্তু ২০২৬ সালে এটিকে আবার অনেকগুলো মানদণ্ড পূরণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, যা যুক্তিসংগত নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

 

ড. কাজী জাহেদ ইকবাল, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও প্যানেল আইনজীবী, ব্লাস্ট, বলেন, “এই ক্ষেত্রে সুবিধা রয়েছে। তবে আমরা যদি ধারা ১৬(৫)-এ দেখি, মামলা আদালতে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। সেক্ষেত্রে এর স্ট্যাটাস কী হবে, তা স্পষ্ট করে বলা নেই। প্রতিবেদন যেটা যাবে, তার স্ট্যাটাস কী হবে, তা এখানেও পরিষ্কার নেই। আমরা আমাদের সাক্ষ্য আইনের দিক থেকে দেখলে এখানে কমিশনকে যেতে হবে, তা না হলে এটার আর কোনো অগ্রগতি থাকবে না। এক্ষেত্রে আইনি বিতর্ক হওয়ার জায়গা থেকে যায়।”

খান খালিদ আদনান, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, বলেন, “এই আইন যেন আমাদের বেশ কিছু আইনের একটি মিশ্রিত সংস্করণ হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ অনেক ট্রিটিতে গেলেও আমাদের বাছাই কমিটিতে কোনো আন্তর্জাতিক আইন জানা ব্যক্তির অন্তর্ভুক্তি নেই, যা হতাশাজনক।” নওশীন নূর, গবেষক ও মানবাধিকার কর্মী, বলেন, “কমিটি কীভাবে গঠিত হচ্ছে, তা থেকেই আমরা বুঝতে পারছি, যেন এই কমিটি নিরপেক্ষ হবে না।” সংবাদপত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, “এই কমিশন যেন আমাদের জন্য ‘a watchdog without a tooth’।”

সোহরাব হাসান, লেখক ও সাংবাদিক, বলেন, “যে রাষ্ট্রে প্রতিটি মানুষের অধিকার থাকবে না, সে রাষ্ট্রে কোনো কমিশনই নিজের কাজ রাষ্ট্রের জন্য করতে পারবে না। অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে ২৬৬ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়, যার মধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি মামলার কোনো সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি নেই। আমরা কি এগুলো নিয়ে মানবাধিকার কমিশনে যেতে পারব?”

সমাপনী বক্তব্যে সারা হোসেন, অনারারি নির্বাহী পরিচালক, ব্লাস্ট ও সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, বলেন, “আমরা সুচিন্তিত এবং একটি নিরপেক্ষ মানবাধিকার কমিশন চাই।” তিনি বলেন, “২০০৯ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত আমরা যা দেখে এসেছি, তার ওপর ভিত্তি করে একটি শক্তিশালী আইন আমরা চাই। আয়নাঘর দেখার পরও কী করে আইনে বলা থাকতে পারে যে, সামরিক বাহিনীর কোনো সেল সম্পর্কে আমরা জানতে পারব না?”—এ প্রশ্ন তোলেন তিনি। তিনি আরও বলেন, “আমাদের সকলের অধিকার এখানে নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বাংলাদেশে বসবাসরত সকলে এর সুফল পান। আমরা ড্রাফট আইনে স্বাগত জানাতে পারি, কিন্তু আমরা এর মধ্যে নির্দিষ্ট পরিবর্তন চাই, যার মাধ্যমে আমরা একটি স্বচ্ছ আইন ও স্বচ্ছ বিচার পেতে পারি।” সমাপনী বক্তব্যে আরও বলা হয়, “আমরা বুঝতে পারছি, কাজগুলো সহজ হবে না। তাই মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত সকল আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে একত্রিত হয়ে একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এগিয়ে যেতে হবে আমাদের। এত কষ্টের পর যদি আমরা ২০০৯ সালের একটি আইনই ফিরে পাই, তাহলে তো আমরা আর এগোতে পারছি না। আমরা ২০০৯ থেকে দুই ধাপ নয়, অনেক বেশি এগোতে চাই।” অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ব্লাস্ট এর উপদেষ্টা আহমাদ ইব্রাহীম

বার্তা প্রেরক:

কমিউনিকেশন বিভাগ, ব্লাস্ট

ই-মেইল: communication@blast.org.bd