১৬ জুন ২০২৬

সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

পুলিশ হেফাজতে ইশতিয়াক হোসেন জনি হত্যা:

হাইকোর্টের রায়ে খালাসপ্রাপ্ত আসামি রাসেলের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে লিভ টু আপিলের অনুমতি প্রদান

পুলিশ হেফাজতে নিহত ইশতিয়াক হোসেন জনি হত্যা মামলায় হাইকোর্ট বিভাগের রায়ে খালাসপ্রাপ্ত পুলিশের সোর্স রাসেলের বিরুদ্ধে ইমতিয়াজ হোসেন রকির আবেদনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) কর্তৃক দায়েরকৃত ক্রিমিনাল পিটিশন ফর লিভ টু আপিলের শুনানি আজ, ১৬ জুন ২০২৬, মহামান্য আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে অনুষ্ঠিত হয়।

মাননীয় বিচারপতি মোঃ রেজাউল হকের চেম্বার আদালতে পিটিশনটি উপস্থাপন করা হলে শুনানি শেষে বিষয়টি ফুল কোর্ট শুনানির জন্য আগামী ২৩ আগস্ট ২০২৬ তারিখ নির্ধারণ করা হয়। উক্ত মামলায় ব্লাস্ট এর পক্ষে উপস্থিত ছিলেন ড. কাজী জাহেদ ইকবাল, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও প্যানেল আইনজীবী, ব্লাস্ট এবং বনরূপা রায়, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও স্টাফ ল’ইয়ার, ব্লাস্ট।

উক্ত ক্রিমিনাল পিটিশন ফর লিভ টু আপিলে হাইকোর্ট বিভাগের ১১ আগস্ট ২০২৫ তারিখে ক্রিমিনাল আপিল নং ৯২২২/২০২২-এ প্রদত্ত রায় ও আদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে বিচারিক আদালতের রায় বাতিল করে পুলিশের সোর্স রাসেলকে খালাস প্রদান করা হয়।

প্রেক্ষাপট:

২০১৪ সালের ০৯ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত আনুমানিক ০২ ঘটিকার দিকে সুমন নামের এক ব্যক্তি মদ্যপ অবস্থায় একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত নারী অতিথিদের বিরক্ত করছিলেন। এ ঘটনার প্রতিবাদ করলে অভিযুক্ত সুমন ও রাসেল পুলিশ নিয়ে এসে বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে ভুক্তভোগী ইশতিয়াক হোসেন জনি ও তার ছোট ভাই ইমতিয়াজ হোসেন রকিকে রাজধানীর পল্লবী থানায় নিয়ে যান। পুলিশ হেফাজতে থাকাকালীন জনি ও তার ভাইয়ের ওপর অমানবিক শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়, যার ফলে জনির মৃত্যু ঘটে। ইশতিয়াক হোসেন জনি পেশায় একজন গাড়িচালক ছিলেন। মৃত্যুকালে তিনি তার বৃদ্ধা মা, স্ত্রী, ১১ বছর বয়সী পুত্র, ৮ বছর বয়সী কন্যাসন্তান এবং ছোট ভাই রকিকে রেখে যান।

ভুক্তভোগীর মা খুরশিদা বেগম থানায় মামলা দায়ের করতে গেলে পল্লবী থানা কর্তৃপক্ষ তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। পরবর্তীতে তিনি ব্লাস্টের সহযোগিতায় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় ঢাকার মূখ্য মহানগর হাকিম আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। একই সময়ে পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) অভিযুক্ত শোভন কুমার সাহা দণ্ডবিধির ১৮৮/৩২৩/৩০২/৩৪ ধারায় (মামলা নং- ১৬, তারিখ- ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৪) জনি, রকি এবং বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত আরও ছয়জন ব্যক্তির বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। উক্ত মামলাটি মূলত পুলিশের হেফাজতে নির্যাতনের ফলে জনির মৃত্যুর ঘটনাটি আড়াল করার উদ্দেশ্যে করা হয়, যেখানে অভিযোগ করা হয় যে বিয়ের রাতে পুলিশ হেফাজতে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে মারামারির ফলে জনির মৃত্যু ঘটে।

পরবর্তীতে জনির ছোট ভাই ইমতিয়াজ হোসেন রকি পুলিশ হেফাজত থেকে মুক্তি লাভের পর, ০৭ আগস্ট ২০১৪ তারিখে বাংলাদেশ জাতীয় নারী আইনজীবী সমিতি (বিএনডব্লিউএলএ)- এর সহায়তায় নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩-এর ১৫ ধারায় ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে দায়রা মামলা নং- ৬১৭১/২০১৪ দায়ের করেন। উক্ত মামলায় তিনজন পুলিশ কর্মকর্তা এসআই জাহিদুর রহমান, এএসআই কামারুজ্জামান মিন্টু এবং এএসআই রাশেদুল হাসান এবং দুইজন পুলিশের সোর্স রাসেল ও সুমনকে আসামি করা হয়।

একই ঘটনার প্রেক্ষিতে তিনটি মামলা দায়ের হওয়ায় আদালত প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের জন্য পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)কে তদন্ত করার নির্দেশ প্রদান করেন। ডিবি কর্তৃক চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর আদালত খুরশিদা বেগম কর্তৃক দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় দায়েরকৃত মামলা এবং এসআই শোভন কুমার সাহা কর্তৃক দণ্ডবিধির ১৮৮/৩২৩/৩০২/৩৪ ধারায় দায়েরকৃত মামলা খারিজ করেন এবং নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩- এর অধীনে রকির দায়েরকৃত দায়রা মামলা নং- ৬১৭১/২০১৪ গ্রহণ করেন।

মামলাটির বিচার চলাকালে আসামি এএসআই রাশেদুল হাসানিএবং এএসআই কামরুজ্জামান মিন্টু ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১ক ধারার অধীনে হাইকোর্টে ক্রিমিনাল মিস মামলা নং–১৩৬৭৮/১৮ দায়ের করে মামলার কার্যক্রম বাতিলের আবেদন করেন। শুনানি শেষে হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ রুল ইস্যু করেন এবং ছয় মাসের জন্য মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন উপরোল্লেখিত দায়রা মামলা নং- ৬১৭১/২০১৪- এর পরবর্তী কার্যক্রমের স্থগিত করেন। এ স্থগিতাদেশ বাতিলের জন্য মৃত জনির ছোট ভাই ইমতিয়াজ হোসেন রকি আইনি সহায়তার জন্য বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)-এর কাছে আবেদন করেন। চূড়ান্ত শুনানি শেষে বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ রায় প্রদান করেন এবং প্রদত্ত স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করতঃ পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে নিম্ন আদালতে মামলার বিচার সম্পন্ন করার নির্দেশ প্রদান করেন। রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি ০৯ মে ২০১৯ তারিখে প্রকাশিত হয় এবং পরবর্তীতে ব্লাস্টের সহায়তায় ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ তারিখে রায়ের কপি ঢাকার আদালতে প্রেরণ করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষে মোট ২৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে দীর্ঘ ছয় বছর পর ২৪ আগস্ট ২০২০ তারিখে মামলার শুনানি সমাপ্ত হয়। পরবর্তীতে ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখে ঢাকার মহানগর দায়রা জজ কে. এম. ইমরুল কায়েসের আদালত বহুল আলোচিত জনি হত্যা মামলায় নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ এর অধীনে প্রথম ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন।

রায়ে এসআই জাহিদুর রহমান, এএসআই রাশেদুল হাসান ও এএসআই কামরুজ্জামান মিন্টুকে নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যূ (নিবারণ) আইন, ২০১৩- এর ১৫(২) ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে প্রত্যেককে যাবজ্জীবন সশ্রম কারান্ড, এক লক্ষ টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে ছয় মাসের সশ্রম কারাদন্ড প্রদান করা হয়। একই সাথে প্রত্যেককে ভুক্তভোগী পরিবারকে দুই লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়। এছাড়া পুলিশ সোর্স সুমন ও রাসেলকে একই আইনের ১৫(৩) ধারায় সাত বছরের সশ্রম কারাদন্ড ও বিশ হাজার টাকা জরিমানায় দণ্ডিত করা হয়।

বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিরা হাইকোর্ট বিভাগে পৃথক পৃথক ফৌজদারী আপিল (৭০২৮/২০২০, ৭৪৯৮/২০২০ ও ৯২২২/২০২২) দায়ের করেন। আপিল গ্রহণের ফলে নিম্ন আদালতের রায় স্থগিত করা হয়।

রাষ্ট্রীয় হেফাজতে সংঘটিত নির্যাতন ও মৃত্যুর মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। এই মামলায় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সরকার ইতিমধ্যে আপিল না করায়, ভুক্তভোগী পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) ইমতিয়াজ হোসেন রকির আবেদনের ভিওিতে মহামান্য আপিল বিভাগে ক্রিমিনাল পিটিশন ফর লিভ টু আপিল দায়ের করে।

বার্তা প্রেরক:

কমিউনিকেশন বিভাগ, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)

ই-মেইল: communication@blast.org.bd

প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন:

বনরূপা রায়, স্টাফ ল’ইয়ার, ব্লাস্ট

মোবাইল: 01776601451

Media Coverage:

(Bangla News)