৯ জুন, ২০২৬

সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

ধর্ষণের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় নয়, বরং প্রতিটি মামলাতেই আইনে নির্ধারিত সময়সীমা মেনে তদন্ত প্রক্রিয়া এবং নিষ্পত্তি সম্পন্ন করার বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করেন বক্তারা

চলমান মামলায় নিয়মিত ও কার্যকর তদারকি ব্যবস্থার অভাব, তদন্ত পরিচালনার ক্ষেত্রে ডিএনএ এবং ফরেনসিক প্রতিবেদন প্রাপ্তির দীর্ঘসূত্রিতা, শাস্তি প্রদান নির্দেশিকার অভাব, এবং ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করা ধর্ষণ অপরাধে ন্যায়বিচার নিশ্চিতের পথে মূল অন্তরায় বলে “ধর্ষণ ও নির্যাতন: আইনগত সুরক্ষায় করণীয়” শীর্ষক মতবিনিময় সভায় উপস্থিত বক্তারা এই মত প্রকাশ করেন। আজ ০৯ জুন ২০২৬ তারিখে জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে দুপুর ৩টা থেকে ধর্ষণ আইন সংস্কার জোট (Rape Law Reform Coalition- RLRC) -এর সচিবালয় হিসেবে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) এর আয়োজনে যৌন ও লিঙ্গ ভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে বিদ্যমান আইনের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিশ্চিত এবং ভুক্তভোগীর সার্বিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা তথা ন্যায়বিচার নিশ্চিতে করণীয় নির্ধারণের লক্ষ্যে মতবিনিময় সভাটি আয়োজিত হয়।

বিচার প্রক্রিয়ায় গতিশীলতা বজায় রাখতে, আইন শৃংখলা বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিতে এবং নারীদের প্রতি সহিংসতার অপরাধে ন্যায়বিচার নিশ্চিতের প্রসঙ্গে এড. শিপ্রা গোস্বামী, আইনজীবী ও সমন্বয়কারী, ব্লাস্ট ফরিদপুর ইউনিট বলেন, বিচার প্রক্রিয়ায় কার্যকরী তদারকি ব্যবস্থা নিশ্চিতে প্রযুক্তিভিত্তিক ই-কেস মনিটরিং ব্যবস্থা, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের মামলা তদারকির ব্যবস্থা, এবং ভুক্তভোগী পুনর্বাসন সংক্রান্ত তদারকির ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকলে ধর্ষণসহ অন্যান্য নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনা হ্রাস পাবে।

ভুক্তভোগী, সাক্ষী, এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের শারীরিক, মানসিক, বা সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য ভুক্তভোগীর পরিচয়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মত প্রকাশ করেন সাংবাদিক ও গবেষক কুররাতুল-আইন-তাহমিনা। ভুক্তভোগীর পরিবারের গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থে পরিচয় সুরক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি সকলের জন্য বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। পুলিশ, রাজনীতিবিদ বা আন্দোলনকারীরা যখন বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ভুক্তভোগীর নাম বা পরিচয় প্রকাশ করে বক্তব্য বা কর্মসূচি পরিচালনা করেন, তখন তা পরবর্তীতে মিডিয়ায় প্রচারিত হলে গোপনীয়তা লঙ্ঘনের ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পায়। তাই ভুক্তভোগীর পরিচয় ও পরিবারের গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়ে বিদ্যমান আইনি বাধ্যবাধকতা সকল অংশীজনের জন্য কঠোরভাবে অনুসরণ করা জরুরি।

ধর্ষণের ভুক্তভোগী নারীর সুরক্ষা নিশ্চিত ও সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের সীমাবদ্ধতা থাকা স্বত্বেও দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পাদনের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন বলে মত প্রকাশ করেন উইমেন সাপোর্ট এন্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের উপ-পুলিশ কমিশনার মোসাঃ লিজা বেগম। বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা সমূহের ক্ষেত্রে পুলিশ বাহিনীর দ্বারা তদন্ত পরিচালনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিবেদন (যেমন – ডিএনএ, ফরেনসিক) প্রাপ্তির দীর্ঘসূত্রিতার পাশাপাশি হাসপাতাল, নাগরিক সামাজিক সংগঠন, সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, এবং যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার সাথে সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের তালিকা নিয়ে প্রস্তুতকৃত একটি তথ্যভান্ডারের অভাবের কথা উল্লেখ করেন তিনি।

দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিতের উদ্দেশ্যে অভিযুক্তের শাস্তি প্রদান করতে গেলে চূড়ান্ত সাক্ষ্য প্রমাণের অভাব ন্যায়বিচারের অনুপস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে বলে মত প্রকাশ করেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান। শুধুমাত্র ভুক্তভোগী নয়, অভিযুক্ত নিজেও ন্যায়বিচারের অধিকারী এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ তদন্ত দল গঠন করা প্রয়োজন, যা ইতোমধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশেই হয়েছে।

পূর্বতন নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান এবং নারীপক্ষ’র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শিরীন পারভিন হক বলেন, সমাজের কোন উপাদানগুলো অপরাধীদের ধর্ষণ বা অন্যান্য সহিংসতার সংঘটনের দিকে ধাবিত করছে সে বিষয়ে, মনোবিজ্ঞান এবং সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে গবেষণা পরিচালনা করা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি, ধর্ষনের অপরাধে ন্যায়বিচার নিশ্চিতের জন্য আইনগত ও কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন, যা সম্ভব হবে রাজনৈতিক নেতা এবং সরকারি প্রতিনিধিদের স্বদিচ্ছায় । ধর্ষণে ভুক্তভোগীদের সুরক্ষার জন্য বিদ্যমান আইন সম্পর্কে জনসাধারণের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে নাগরিক সমাজ সংগঠন কর্তৃক কার্যক্রম গ্রহন করা প্রয়োজন। এছাড়াও আইনী বিধান মেনে দ্রুত বিচার কাজ সম্পন্ন করার জন্য ফরেনসিক পরীক্ষার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন বলে মত প্রকাশ করেন তিনি।

আইন কমিশনের কার্যতালিকার মধ্যে থাকা একটি অভিন্ন শাস্তি প্রদান নির্দেশিকা প্রণয়ন, ধর্ষণ অপরাধের ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার ও প্রতিকার নিশ্চিতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন আইন কমিশন এর সভাপতি বিচারপতি জিনাত আরা। মামলার নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রিতা এবং তদন্ত কর্মকর্তা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী কর্মকর্তার সংকট ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার ও প্রতিকার নিশ্চিতের পথে একটি বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভুক্তভোগী এবং অভিযুক্ত উভয়পক্ষের আইনি প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতের বিষয়ে নাগরিক সামাজিক সংগঠনসমূহের সচেতনতা প্রশংসার দাবি রাখে।

ধর্ষণের ভুক্তভোগীর প্রতি সংবেদনশীল আচরণের বিষয়টি উল্লেখ করে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মাননীয় বিচারপতি (অবসরপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ ইমান আলী বলেন, বিচার ব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তি , যথা-বিচারক, আইনজীবী, এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মানসিকতায় পরিবর্তন নিয়ে আসা প্রয়োজন। বিচার ব্যবস্থা দ্রুত, কার্যকর এবং দৃশ্যমান না হলে অপরাধীরা মনোবলে বলিয়ান হয়ে যাবে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। সামাজিক অবক্ষয়কে ধর্ষণ এবং নারীর প্রতি সংঘটিত অন্যান্য সহিংসতার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পিতামাতার মাধ্যমে পারিবারিক পর্যায় এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে সচেতনতা তৈরি এরূপ অবক্ষয় প্রতিরোধের অন্যতম পন্থা। বিচার বিভাগের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল ব্যাক্তিবর্গ এবং সামাজিক পর্যায় থেকে সকলের সহিংসতায় নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মত প্রকাশ করেন তিনি।

এছাড়াও সভায় উপস্থিত অন্যান্য বক্তারা নারী ও শিশু নির্যাতনের ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, বিচারপ্রক্রিয়ার কার্যকারিতা বৃদ্ধি, চলমান মামলার নিয়মিত তদারকি নিশ্চিতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় প্যারালিগাল মেকানিজম গঠন, শুধুমাত্র ঢাকা কেন্দ্রিক না করে জেলা/উপজেলা/ইউনিয়ন প্রতিটি পর্যায়ে আশ্রয়কেন্দ্র (Shelter Home) নির্মাণ এবংসাক্ষ্য আইন (সংশোধিত) ২০২২ এ ভুক্তভোগীর চারিত্রিক সাক্ষ্য সংশ্লিষ্ট ধারা ১৪৬(৩) এর সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত, হাইকোর্ট কর্তৃক ধর্ষণে ভুক্তভোগীর শারীরিক পরীক্ষার ক্ষেত্রে দুই আঙ্গুলি পরীক্ষা (Two Finger Test) এর ব্যবহার নিষিদ্ধকরণ বিষয়ক রায়ের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন এবং পৃথক ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষা আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি উঠে আসে।

সারা হোসেন, অনারারি নির্বাহি পরিচালক, ব্লাস্ট ও সিনিয়র এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট তাঁর স্বাগত বক্তব্যে, সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখেছি, কোনো কোনো আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা ঘটলে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রও সেই চাপের প্রেক্ষিতে পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, কেবল আলোচিত বা জনমতের কেন্দ্রে থাকা মামলাগুলোতেই নয়, বরং সব ক্ষেত্রেই আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি, যেখানে একদিকে ভুক্তভোগীর সুরক্ষা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে অভিযুক্তের ন্যায্য বিচার পাওয়ার অধিকারও সমানভাবে সংরক্ষিত থাকবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তাসলিমা ইয়াসমিন সঞ্চালনায় ও সমাপনি বক্তব্যে এবং ব্লাস্টের অনারারি নির্বাহি পরিচালক সারা হোসেনের স্বাগত বক্তব্যের মাধ্যমে মতবিনিময় সভায় সম্মানিত অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন বিচারপতি জিনাত আরা, সভাপতি, আইন কমিশন এবং মোহাম্মদ ইমান আলী, মাননীয় বিচারপতি (অবসরপ্রাপ্ত), আপিল বিভাগ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

বার্তা প্রেরক

ধর্ষণ আইন সংস্কার জোট এর সচিবালয়ের পক্ষে

কমিউনিকেশন বিভাগ, ব্লাস্ট।

ই-মেইল: communication@blast.org.bd

প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন:

এডভোকেট আয়েশা আক্তার,

ফোকাল পারসন, ধর্ষণ আইন সংস্কার জোট এবং লিগ্যাল স্পেশালিস্ট (জেন্ডার জাস্টিস এন্ড ওমেন্স এমপাওয়ারমেন্ট), ব্লাস্ট।

মোবাইল: 01728-978465

আরো তথ্য জানতে দেখুন –

Web: https://blast.org.bd/campaigns/rape-law-reform-now/

Facebook: https://www.facebook.com/rapelawreformcoalition

Media Coverage:

(Bangla News)

(Englsih News)

(TV)