মানবাধিকার সুরক্ষা ও উন্নয়নকে আরও কার্যকর করার লক্ষ্যে “জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬” প্রণয়নে সরকারের উদ্যোগকে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) স্বাগত জানাচ্ছে। প্রস্তাবিত বিলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ (অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় প্রণীত এবং বর্তমান সরকার কর্তৃক বাতিল হওয়া) এর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে, বিদ্যমান জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯-এর তুলনায় প্রস্তাবিত বিলটি কমিশনের ক্ষমতা ও কার্যপরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারণ করেছে।
ব্লাস্ট মনে করে, মানবাধিকার বিষয়ে বিশেষজ্ঞ পাঁচজন সার্বক্ষণিক কমিশনার নিয়োগের বিধান প্রবর্তন এবং কমিশন গঠনের জন্য বাছাই কমিটিতে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী সংস্কার। এছাড়াও, বাংলাদেশ কর্তৃক অনুসমর্থিত নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক বা লাঞ্ছনাকর আচরণ এবং দণ্ডবিরোধী সনদের ঐচ্ছিক প্রটোকল (OPCAT)-এর উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রস্তাবিত বিলে জাতীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা বিভাগ (National Preventive Mechanism Division) প্রতিষ্ঠার বিধান রাখা হয়েছে। বিলটি আইন হিসেবে প্রণীত হলে, কমিশনের ভূমিকা কেবল সুপারিশ প্রদানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন সংক্রান্ত নির্দেশনা প্রদানসহ উপযুক্ত প্রতিকার প্রদানের ক্ষমতাও কমিশন লাভ করবে।
এছাড়াও, প্রস্তাবিত বিলে কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে সাক্ষ্যপ্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে—এমন বিধান অন্তর্ভুক্ত করাকে ব্লাস্ট স্বাগত জানায়। তবে কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা ও কার্যকারিতা নির্ভর করবে চূড়ান্ত আইনটি একটি সত্যিকারের স্বতন্ত্র ও প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠান গঠনে সক্ষম হচ্ছে কি না তার উপর এবং এক্ষেত্রে কমিশনার সব ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্ত ও প্রতিকারের প্রকৃত ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন। তারই প্রেক্ষাপটে কমিশনকে আরও কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার লক্ষ্যে ব্লাস্ট আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় বরাবর কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ প্রদান করেছে, যার মধ্যে মৌলিক কয়েকটি সুপারিশ নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
কমিশনের স্বাধীনতা ও বৈচিত্র্য জোরদার করা
o কমিশনের গঠন ও নিয়োগ প্রক্রিয়া নির্বাহী বিভাগের প্রভাব থেকে মুক্ত করতে হবে;
o কমিশনে প্রতিনিধিত্বের বিষয় শক্তিশালী করতে ব্লাস্ট সুপারিশ করেছে যে, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বর্তমান “বিশেষ বিবেচনা”র বিধানটি বাদ দিয়ে নতুন ধারা সংযোজন করা, যাতে অন্তত দুইজন কমিশনার নারী এবং অন্তত একজন কমিশনার সংখ্যালঘু বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী হন;
o কমিশনার নিয়োগের সুপারিশকারী বাছাই কমিটিতে একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক অন্তর্ভুক্ত করা; এবং
o কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কমিশনকেই তার নিজস্ব বিধিবিধান ও কার্যপদ্ধতি প্রণয়নের ক্ষমতা প্রদান করা জরুরী।
মানবাধিকার লঙ্ঘন তদন্ত ও প্রতিকারে কমিশনের ক্ষমতা জোরদার করা
o অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের ক্ষেত্রে, কমিশনের সুস্পষ্ট ও কার্যকর ক্ষমতা থাকা আবশ্যক;
o শুধুমাত্র নির্ধারিত তদন্ত কর্মকর্তার উপর নির্ভর না করে কমিশনারদের নিজস্বভাবে তদন্ত পরিচালনার ক্ষমতা দেওয়া অত্যন্ত জরুরী; এবং
o আইনশৃঙ্খলা বা নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে সরকারি সংস্থাগুলোকে বাধ্যতামূলক তিন মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। এক্ষেত্রে প্রতিবেদন পর্যালোচনা এবং বিবেচনার পর প্রয়োজন মনে করলে কমিশন নিজেও তদন্ত পরিচালনা করতে পারবে।
অধিকতর স্বচ্ছতা ও জনসাধারণের কাছে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা
o কমিশনের প্রতি জনগণের আস্থা গড়ে তুলতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা গুরুত্বপূর্ণ, সেই লক্ষ্যে কমিশনের কার্যবলী বার্ষিক প্রতিবেদন আকারে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করবে (অবশ্যই ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং ভুক্তভোগীদের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে); এবং
o কমিশনের প্রতিবেদন প্রাপ্তির ৩০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদের স্পিকারকে প্রতিবেদনটি সরাসরি জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা প্রদান করা যেতে পারে। এর ফলে সময়োপযোগী সংসদীয় তদারকি এবং জনসাধারণের প্রতি জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।
পটভূমি:
২০২৬ সালের ১৭ মে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬-এর খসড়ার ওপর একটি অংশীজন পরামর্শ সভার আয়োজন করে। পরামর্শ সভা শেষে অংশগ্রহণকারী অংশীজনদের কাছ থেকে খসড়া আইনের বিষয়ে লিখিত সুপারিশ আহ্বান করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায়, একটি স্বাধীন ও কার্যকর জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চলমান প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ব্লাস্ট ২০২৬ সালের ২৪ মে খসড়া আইনের ওপর তার লিখিত সুপারিশ মন্ত্রণালয়ে দাখিল করে।
বার্তা প্রেরক:
কমিউনিকেশন বিভাগ, ব্লাস্ট
ই-মেইল: communication@blast.org.bd
