০৪ এপ্রিল ২০২৬

সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

স্বেচ্ছাচারী গ্রেফতার রোধে আইনের কার্যকর প্রয়োগ ও জবাবদিহিতা জোরদারের আহ্বান জানান – মতবিনিময় সভার বক্তারা

সরকার, ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদেরকে প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা না করে অন্তর্ভুক্তিমুলকভাবে সামাজিক সংস্কারের মাধ্যমে স্বেচ্ছাচারী গ্রেপ্তার এবং আটক নিরসন করা সম্ভব- বলে মতপ্রকাশ করেন ৪ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে দ্য ডেইলি স্টার সেন্টারের আজিমুর রহমান সম্মেলন কক্ষে “বাংলাদেশে গ্রেফতার ও আটক: প্রেক্ষাপট ও আইনগত বিশ্লেষণ” শীর্ষক এই আলোচনা সভায় বক্তারা। ব্লাস্ট-এর আয়োজনে উক্ত মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন আইনজীবী, গবেষক, শিক্ষাবিদ, বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সদস্য এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের আইন বিভাগের ডিন মোঃ নাজমুজ্জামান ভূইঁয়া বলেন, “স্বীকারোক্তি হতে হয় বিবেকের তাড়নায় বা স্বেচ্ছায়। তবে চর্চায় দেখা যায়, পুলিশ কাস্টডিতে নেয়ার পরে সবাই স্বীকারোক্তি দেয়। রিমান্ড প্রক্রিয়ার অস্তিত্বই প্রমাণ করে স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তি পাওয়া যায়নি। সেক্ষেত্রে রিমান্ডে প্রাপ্ত স্বীকারোক্তি সংবিধানের সরাসরি সাংঘর্ষিক। আমরা আইন প্রণয়নে যতটা গুরুত্ব দিই, বাস্তবায়নে ততটা নয়, ফলে সংস্কার শুধুমাত্র কাগজে সীমাবদ্ধ থেকে যায়।” তিনি আরো বলেন, যে “ বিচার বিভাগ, পুলিশ বা সরকার কেউই কারোর প্রতিপক্ষ নয়; বরং সকলে এক সাথে কাজ করলেই সম্ভব একটি জবাবদিহিতা ও মানবাধিকার ভিত্তিক সমাজ সৃষ্টি করা।”

মূল প্রবন্ধের উপর আলোচনায় বক্তারা উল্লেখ করেন যে, সাম্প্রতিক ফৌজদারী কার্যবিধির সংশোধনীর মাধ্যমে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হলেও এর বাস্তব প্রয়োগ এখনও সন্তোষজনক নয়। বিচারিক বিবেক বা স্বাধীন মূল্যায়নের যে প্রতিফলন প্রত্যাশিত, বাস্তবে তা অনেক ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। বক্তারা আরও বলেন, অনেক দেশে তুলনামূলক কম আইন থাকা সত্ত্বেও মানুষ বেশি নিরাপদ, অথচ আমাদের দেশে বহু আইন বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও নিরাপত্তার ঘাটতি রয়ে গেছে; তাই এখন সময় এসেছে রাষ্ট্রকে প্রকৃত অর্থে ন্যায়, জবাবদিহিতা ও সুশাসনভিত্তিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যাওয়ার। এ জন্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের প্রথাগত ও প্রচলিত আইনি অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি আস্থা তৈরি এবং গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে কার্যকর স্ক্রিনিং ব্যবস্থা চালু করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন বক্তারা।

বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার ও আটকের ভুক্তভোগীরা তাদের অভিজ্ঞতা বিনিময়কালে বলেন, এ ধরনের ঘটনায় মামলা করার জন্য ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরী। একই সাথে, আদালতের আদেশ সমূহ সুস্পষ্ট ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ প্রয়োজন। এ ধরনের অপরাধের ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসনে মানবাধিকার সংগঠনের পাশাপাশি রাষ্ট্রকেও তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের ওপর জোর দেন তারা।

মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা স্বেচ্ছাচারী গ্রেপ্তার এবং আটক নিরসনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমে প্রযুক্তির ব্যবহার, বিশেষত বডি ক্যামেরা চালু করা; পুলিশ সংস্কার কমিশনের সুপারিশসমূহ বাস্তবায়ন; এ ধরনের ঘটনার ভুক্তভোগীদের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও সংরক্ষণ; সন্ধ্যার সময় আদালতে চালান দেওয়ার মতো নিয়মিত চর্চার পুনর্বিবেচনা; এবং পুলিশের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো গ্রহণে আদালতের অনাগ্রহ দূর করার কথা উঠে আসে। এছাড়া আলোচনায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কার্যকরী সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহিতা বৃদ্ধি, আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিচারিক জবাবদিহিতা শক্তিশালী করা, রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিদের ভূমিকা আরও নিরপেক্ষ করা, এবং সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোকে এ বিষয়ে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ প্রদানের সুপারিশ করা হয়।

অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন, যার মধ্যে বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার এবং আটকের সুরক্ষা, গ্রেফতারের কারণ এবং আনীত অভিযোগ সম্পর্কে অবগত হওয়ার অধিকার, আটকের ক্ষেত্রে বিচারিক নিয়ন্ত্রণ, নির্দোষ হিসেবে অনুমিত হওয়ার নীতি এবং ক্ষতিপূরণের অধিকারের বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। তিনি তার প্রবন্ধের সুপারিশে বলেন- ”আমাদের আইনে দুর্বলতা যেমন আছে, তেমনি ইতিবাচক দিকও আছে। কিন্তু আইনের কার্যকর বাস্তবায়নের অভাবেই বিচারব্যবস্থার সাফল্য অনেকাংশে সরকারের সুশাসন নিশ্চিত করার সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে। আগেভাগেই কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার ‘ট্যাগিং’ সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।”

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. কাজী জাহেদ ইকবালের সঞ্চালনায় সভার উদ্দেশ্য তুলে ধরেন ব্লাস্টের আইন বিভাগের পরিচালক এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো: বরকত আলী। সভায় মূল প্রবন্ধের উপর আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য আরমান হোসাইন, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ল-এর সহকারী অধ্যাপক মোঃ মোস্তফা হোসেন, এবং ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোঃ বদিউজ্জামান তপাদার। সেইসাথে ভুক্তভোগী হিসেবে অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন লিমন হোসেন এবং ইমতিয়াজ হোসেন রকি।

বার্তা প্রেরক:

কমিউনিকেশন বিভাগ, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)

ই-মেইল: communication@blast.org.bd

Media Coverage:

(Bangla NEWS )

( Englsih News )