সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আক্রান্ত এলাকা

সরেজমিন পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা এবং আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধর্মীয় সংখ্যালঘুসহ সকল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর

নিরাপত্তা ও ভোটাধিকার প্রয়োগে সম-নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিতে-

সংবাদ সম্মেলন

৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, রোবাবার, সকাল ১১ টা।

স্থান সাগর রুনি মিলনায়তন

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, সেগুনবাগিচা, ঢাকা।

আয়োজনে: সিটিজেনস্ ফর হিউম্যান রাইটস

 

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,

সিটিজেনস্ ফর হিউমেন রাইটস এর পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানবেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট জাতীয় জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা আশা করছি এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক উত্তোরণের পথে ধাবিত হবে এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার- সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে যাবে। স্বাধীনতার ৫৫ বছরের পরও বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো গণতান্ত্রিক ও মানবিক হতে না পারার কারণে আমরা পরিলক্ষিত করছি যে, জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা নানাভাবে নিপীড়ন ও বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে। তাঁরা ক্রমাগত রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহন প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়ছেন। অন্যদিকে ধর্মীয় ও মৌলবাদী একটি চক্র সংখ্যালঘু নাগরিকদের নীতি-নির্ধারণী প্রক্রিয়া থেকে বঞ্চিত রাখার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখছে। আমাদের পর্যবেক্ষণ বলছে- প্রত্যেকটি জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে বা পরে সংখ্যালঘু জনপদের নাগরিকদের আতঙ্ক, ভয় যেন আজ চরম সত্যে পরিণত হচ্ছে। এই সত্য একদিকে মুক্তিযুদ্ধের মৌলচেতনা এবং অন্যদিকে অসাম্প্রদায়িক ও সকল নাগরিকের বাংলাদেশ নির্মাণের লড়াইয়ের আকাঙ্খার সাথে প্রতারণা। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বেও দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু, বিশেষ করে সনাতন ধর্মের অনুসারীদের উপর বিভিন্ন সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। ইতিমধ্যেই চট্টগ্রামের রাউজানে গত ১ নভেম্বর ২০২৫ থেকে কমপক্ষে ১২ টি সনাতন ধর্মাবলম্বীর বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় বাহির থেকে তালা লাগিয়ে আগ্নিসংযোগের মত ন্যাক্কারজনক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এতে প্রতীয়মান হয় যে, এ পরিবারগুলোর সকলকে পুড়িয়ে মারাই ছিল অগ্নিসংযোগকারীদের উদ্দেশ্য। এছাড়াও মিরসরাইয়ে ৭ টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এসব ঘটনাবলী সরেজমিন পর্যবেক্ষণের জন্য সিটিজেনস্ ফর হিউমেন রাইটস্ এর একটি প্রতিনিধি দল গত ১লা ফেব্রুয়ারি ২০২৬, চট্টগ্রামের রাউজান এবং মিরসরাইয়ের আক্রান্ত এলাকায় যান। সেসব পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ধর্মীয় সংখ্যালঘুসহ সকল প্রান্তিক জাতিগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও ভোটাধিকার প্রয়োগে সম-নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করার নিমিত্তে নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও পদগুলোর প্রতি আহ্বান জানানোর জন্য আজকের সংবাদ সম্মেলন।

গণমাধ্যমের প্রিয় বন্ধুগণ,

গত ১লা ফেব্রুয়ারি ২০২৬, রবিবার, প্রতিনিধি দলটি সকাল ৯.৩০ টা নাগাদ চট্টগ্রামের রাউজান পৌরসভার বনিক পাড়া, সুলতানপুর এলাকায় পৌঁছায়। এ এলাকায় স্থানীয়দের তথ্যমতে, হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রায় ৮৫,০০০ ভোটার রয়েছেন। সেখানে আমরা আরতি শীল এর পোড়া ভিটায় গিয়ে উপস্থিত হই। গিয়ে দেখা যায়, প্রবীণ নারী আরতি শীল গুমড়ে কাঁদছেন। সর্বস্ব হারিয়ে নিজ বাড়িঘর সম্পূর্ণ পুড়িয়ে দেওয়ার কথা আমাদেরকে জানিয়েছেন। ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫, রাত ৩.২০ মিনিটে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে অগ্নি সংযোগ করে দুর্বৃত্তরা। উদ্দেশ্য ছিল বাড়ির ভেতর থাকা মানুষদের পুড়িয়ে মারা। আরতিশীলদের পরিবারের সদস্যরা সেদিন কোনোমতে দা দিয়ে বেড়া কেটে ঘর থেকে বের হন এবং জীবন বাঁচান। জানা যায়, তাঁদের ঘরটি ২০ মিনিটের মধ্যে সম্পূর্ণ ভস্মিভূত হয়ে যায়। বাড়ির ভেতরে থাকা আসবাবপত্র, সমস্ত গৃহস্থালির জিনিসপত্র ও আরতি শীল এর ছোট ছেলে মিঠুন শীল এর পাসপোর্ট, কাতার গমনের ওয়ার্ক পারমিটসহ সমস্ত কিছুই পুড়ে যায়।

ঐ এলাকায় কমপক্ষে ১২ টি ঘরে তালা লাগিয়ে আগুন দেয়া হয়েছে। প্রত্যেকবার আগুন দেওয়ার পরে রহস্যজনকভাবে দুর্বৃত্তদের টানানো ব্যানারও পাওয়া গেছে। যেখানে স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের নাম ও কয়েকটি মোবাইল নাম্বার লেখা ছিল। তবে প্রদত্ত মোবাইল নাম্বারগুলো স্থানীয় দোকানদারদের বলে ভুক্তভোগীরা জানান। ভুক্তভোগী অন্যান্যদের মধ্যে রুবেল দাশ, বিমল তালুকদার, প্রভাত পাল, অধির পাল, মৃদুল কান্তি মুহুরী, শ্যামল কুমার দে’সহ স্থানীয় সাধারণ জনগণ, পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দ প্রতিনিধি দলের কাছে ঘটনাবলীর বিবরণ তুলে ধরেন। সেসময় বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। পরে আমরা মিরসরাই উপজেলার ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের জাফরাবাদ হিন্দুপাড়ায়ও যাই। সেখানে এক সপ্তাহে মন্দির, বসতঘর, খড়ের গাদাসহ সাত স্থানে দুর্বৃত্তরা অগ্নিসংযোগ করে।

আমরা এও জানতে পারি যে, উভয় এলাকার সনাতন ধর্মের মানুষ এখন রাত জেগে পাহাড়া দিয়ে পালাক্রমে ঘুমাচ্ছেন এবং নিরাপত্তার জন্য সিসিটিভি ক্যামেরা লাগিয়ে এলাকা পর্যবেক্ষণ করছেন। তবে এলাকার ভুক্তভোগী মানুষ আমাদের জানিয়েছেন, তাঁরা যখন রাতে ঘুমাতে যান তখন মনের ভেতরে থাকে একগুচ্ছ ভয় ও আতংক।

প্রিয় সংবাদ কর্মী বন্ধুগণ,

কেবলমাত্র চট্টগ্রামের রাউজান ও মিরসরাই নয়, ১২ জানুয়ারি ২০২৬ এর ডয়েস ভেলে’র প্রতিবেদন অনুযায়ী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে যশোরের মনিরামপুর, শরিয়তপুরের ডামুড্যা, নরসিংদি’র পলাশ উপজেলায়, ময়মনসিংহের ভালুকাসহ কয়েক স্থানে অন্তত ৮ জন সনাতন ধর্মানুসারী হত্যার শিকার হয়েছে। তার মধ্যে ময়মনসিংহের ভালুকায় গত ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫, রাতে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস বিডি লিমিটেড কোম্পানির শ্রমিক ২৮ বছর বয়সী দিপু দাসকে পিটিয়ে হত্যা করা হয় এবং পরে তার মরদেহ ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে গাছের ডালের সঙ্গে বেঁধে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার মত ন্যক্কারজনক ঘটনা সংঘটিত হয়।

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের তথ্যমতে জানা যায়, গত ডিসেম্বর ‘২৫ এ বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর কমপক্ষে ৫১ টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। তার মধ্যে ১০ টি হত্যা, ১০ টি চুরি ও ডাকাতি’র অভিযোগ, ২৩ টি বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, মন্দির, জমিদখল, লুটপাত ও অগ্নিসংযোগ সংক্রান্ত এবং ৪ টি ধর্মীয় অবমাননা ও ভারতের গোয়োন্দা সংস্থা র’ এর দালালির অভিযোগে আটক ও নির্যাতন সংক্রান্ত, ১ টি ধর্ষণচেষ্টা ও ৩ টি শারিরীক নির্যাতনের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।

এছাড়া হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৫ সালে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর ৫২২ টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এসবের মধ্যে ৬৬ টি হত্যা; ৩৮ টি নির্যাতন ও অপহরণ; ২৮ টি নারী সহিংসতা (ধর্ষণ, গণধর্ষণ); ৪৭ টি শারিরীক আক্রমণ বা মৃত্যু হুমকি: ৯৫ টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উপর হামলা ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ; ৩৬ টি ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গ্রেফতার ও নিপীড়ন, ২১ টি ভূমি দখলের; ৬৬ টি বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জোরপূর্বক দখল; ১০২ টি বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আক্রমণ, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ ও ২৯ টি অন্যান্য সহিংসতার ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।

প্রিয় বন্ধুগণ,

আমাদের সরেজমিন পর্যবেক্ষণ ও সামগ্রিক অভিজ্ঞতা বলছে- আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পূর্বে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর এমন সহিংসতা ঘটনোর মূল উদ্দেশ্য হলো বিভিন্ন স্থানে আতংক ছড়িয়ে দিয়ে সংখ্যালঘুদেরকে ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত রাখা। আমরা দেখেছি, রাউজান ও মিরসরাইয়ে সংঘটিত সহিংসতাগুলো ঠেকানোর ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়াও কার্যকরী কোনো আইনী ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ না নিয়ে সংখ্যালঘু নাগরিকদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা প্রদানের বিষয়টি বিঘ্নিত হচ্ছে বলে আমাদের কাছে প্রতীয়মান হেেয়ছে।

আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে আপনাদের মাধ্যমে জাতীয় নির্বাচনে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও অপরাপর প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নাগরিকদের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নির্বিঘ্নে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার লক্ষে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, নির্বাচন কমিশন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছে নিম্নাক্ত দাবিসমূহ উত্থাপন করছি-

১. ধর্মীয় সংখ্যালঘু অধ্যুষিত নির্বাচনী এলাকায় ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহকে বিশেষ কার্যকরী উদ্যোগ ও পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করা এবং এ বিষয়টি নিয়মিত তদারকির জন্য উচ্চ-পর্যায়ের একটি বিশেষ কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক সেল গঠন করা;

২. রাউজান ও মিরসরাইসহ দেশের বিভিন্নস্থানে সংখ্যালঘুদের উপর সংঘটিত সকল ধরণের সহিংসতার তদন্ত, দোষীদের দ্রুত গ্রেফতার পূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করা;

৩. ক্ষতিগ্রস্থদের ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণের জন্য যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রকৃত ক্সতি নিরূপণ পূর্বক ভুক্তভোগীদেও পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা;

৪. ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের সদস্যদের মানসিক আঘাত দুরীকরণের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহন করা; এবং

৫. নবগঠিত মানবাধিকার কমিশনের কাছে আমাদের আহ্বান- কমিশন যাতে এ বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নজরদারিতে রাখেন এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করেন।

সেইসাথে নির্বাচনমুখী সকল রাজনৈতিক দলসমূহের প্রতি ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার জন্য এবং নির্বাচন পরবর্তী নিরাপত্তা প্রদানের ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা রাখার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।

ধন্যবাদান্তে,

সিটিজেনস ফর হিউমেন রাইটস